ভাবুন—আপনি কাজ করছেন, হাঁটছেন বা ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। হঠাৎ আশপাশ কেঁপে উঠল, দুলে উঠল আসবাবপত্র। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক। ভূমিকম্পের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—একবার ঝাঁকুনি শুরু হলে তার পরপরই আরও বড় আফটারশকের আশঙ্কা থাকে। তাই কম্পন থেমে গেলেই নিরাপদ—এমন ভাবা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
ভূমিকম্প আগে থেকে নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া এখনো পৃথিবীর কোথাও সম্ভব নয়।
তাই বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে ব্যক্তিগত প্রস্তুতি, ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিয়মিত মহড়া, এবং পরিবারসহ সচেতনতা বাড়ানো।
নিচে জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয়গুলো তুলে ধরা হলো—
ঘরের ভেতরে থাকলে কোথায় আশ্রয় নেবেন?
🔸 ভূমিকম্প শুরু হলে ড্রপ–কাভার–হোল্ড অন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর।
ড্রপ: দ্রুত মেঝেতে নেমে পড়ুন
কাভার: শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন
হোল্ড অন: কাভার ধরে রাখুন, প্রয়োজন হলে কাভারসহ নড়তে পারবেন এমন অবস্থায় থাকুন
🔸 বিছানায় থাকলে বালিশ বা কাঁথা দিয়ে মাথা ঢেকে রাখুন।
🔸 ভবন গুরুতর ঝুঁকিতে মনে হলে দ্রুত খোলা জায়গায় বেরিয়ে যান। তবে লাফ দেওয়া বা জানালা দিয়ে নামার মতো সিদ্ধান্ত কখনোই নেবেন না।
🔸 বের হতে না পারলে শক্ত পিলারের পাশে দাঁড়ান। এটি তুলনামূলক নিরাপদ।
গ্যাস ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ করুন
🔸 কম্পন শুরুতে গ্যাস চুলা বন্ধ করুন।
🔸 টিভি, ফ্যান, ফ্রিজসহ ইলেকট্রনিক যন্ত্র বন্ধ রাখলে শর্ট সার্কিট ও আগুন লাগার ঝুঁকি কমে।
ধুলাবালির মধ্যে শ্বাসরোধ ঠেকাতে যা করবেন
🔸 দেয়াল–সিলিং ভেঙে ধুলা তৈরি হলে নাক–মুখ কাপড়, ওড়না বা হাতা দিয়ে ঢেকে রাখুন।
🔸 ভিড় বা বাজার–হাসপাতাল–সিনেমা হলে দৌড়াদৌড়ি করবেন না। এতে পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
লিফট নয়, সিঁড়িই আপনার জীবনরক্ষাকারী পথ
🔸 ভূমিকম্প চলাকালীন কিংবা কমে যাওয়ার পর কখনোই লিফট ব্যবহার করবেন না।
🔸 সবসময় সিঁড়ি ব্যবহার করুন, তবে ঠেলাঠেলি নয়—সতর্কভাবে নামুন।
গাড়িতে থাকলে করণীয়
🔸 গাড়ি সাথে সাথে থামান।
🔸 ফ্লাইওভার, সেতু, বড় গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন।
🔸 কম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভিতরেই থাকুন।
জরুরি উপকরণ আগে থেকেই প্রস্তুত রাখুন
একটি ছোট Earthquake Emergency Kit বানিয়ে রাখুন:
✔ টর্চ
✔ ব্যাটারি
✔ পানির বোতল
✔ শুকনো খাবার
✔ ফার্স্ট এইড বক্স
✔ জরুরি ফোন নম্বর লেখা কাগজ
গাড়িতেও একটি ছোট ফার্স্ট এইড কিট রাখলে ভালো।
ধ্বংসস্তুপে আটকে গেলে কী করবেন?
🔸 শরীর বেশি নড়াচড়া করবেন না—আঘাত বাড়তে পারে।
🔸 ম্যাচ বা আগুন জ্বালাবেন না—গ্যাস লিক থাকার ঝুঁকি থাকে।
🔸 শ্বাসকষ্ট এড়াতে নাক–মুখ ঢেকে রাখুন।
🔸 চিৎকার না করে—দেয়ালে আঘাত, পাইপে টোকা বা শিস দিয়ে শব্দ করুন।
ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনা: আগে থেকে প্রস্তুত থাকুন
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC 2020) অনুযায়ী—
🔸 ভবন অবশ্যই ভূমিকম্প প্রতিরোধী নকশায় তৈরি হতে হবে
🔸 ঝুঁকিপূর্ণ–পুরোনো ভবন সংস্কার ও শক্তিশালী করতে হবে
🔸 গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ লাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
🔸 প্রতিটি ভবনে জরুরি ফোন নম্বর দৃশ্যমান স্থানে টানাতে হবে
ফায়ার সার্ভিস বলছে—মহড়া এবং সচেতনতার অভাবই প্রাণহানি বাড়ায়, তাই নিয়মিত প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
